মোঃ ফয়সাল হোসেন কয়রা উপজেলা প্রতিনিধি।।
খুলনার কয়রা উপজেলায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, চায়ের দোকান, জনসমাগমস্থল ও নিরিবিলি এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজা সেবনের পাশাপাশি ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে এক শ্রেণির তরুণ ও কিশোর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ছোট ছোট এজেন্টের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ী ও অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, মাদকের সহজলভ্যতা এবং মোবাইলভিত্তিক অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন সামাজিক সমস্যার পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তিরও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ লেখাপড়া, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে মাদক ও জুয়ার দিকে ঝুঁকছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশ্যে গাঁজা সেবনের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে গাঁজা সেবনের ঘটনা চোখে পড়ে। চায়ের দোকান, বাজারের আশপাশ, রাস্তার পাশে কিংবা নিরিবিলি স্থানে কয়েকজন যুবককে একসঙ্গে বসে মাদক সেবন করতে দেখা যায় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “আগে মাদক সেবনকে মানুষ লুকিয়ে রাখত। এখন অনেক জায়গায় প্রকাশ্যেই গাঁজা সেবনের অভিযোগ শোনা যায়। এতে ছোট ছেলেদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।”
আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, মাদকের পেছনে অর্থের জোগান দিতে গিয়ে অনেক তরুণ পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কারও কারও বিরুদ্ধে ঘরের মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী কিংবা মূল্যবান জিনিস বিক্রি করে মাদকের টাকা জোগাড় করার অভিযোগও রয়েছে।
ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ, ছোট এজেন্টদের নিয়ে উদ্বেগ স্থানীয়দের দাবি, ইয়াবা সরবরাহের ক্ষেত্রেও ছোট ছোট এজেন্ট বা সরবরাহকারীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীকে আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের মূল সরবরাহকারী, পৃষ্ঠপোষক ও অর্থের উৎস শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
‘প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়’ থাকার অভিযোগ
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান হলেও মূল হোতারা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা সম্পর্কে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো যাচাই করে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
অনলাইন জুয়া যেন নতুন নেশা
মাদকের পাশাপাশি কয়রায় তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি চায়ের দোকান ও আড্ডাস্থলে বসে তরুণদের মোবাইল ফোনে এসব কার্যক্রমে যুক্ত হতে দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।
প্রথমদিকে অল্প টাকা দিয়ে খেললেও পরবর্তীতে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পাশাপাশি ধার-দেনা করে জুয়ায় অর্থ বিনিয়োগ করছেন। অর্থ হারানোর পর মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কাও করছেন সচেতন মহল।
মাদক ও জুয়া—দুইয়ের যোগসূত্র নিয়েও উদ্বেগ স্থানীয়দের মতে, মাদক সেবন এবং অনলাইন জুয়া—দুটিই তরুণদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনলাইন জুয়ায় টাকা হারানোর পর কেউ কেউ দ্রুত অর্থের সন্ধানে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। আবার মাদকাসক্ত তরুণদের একটি অংশও অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় এতে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের দাবি, বিষয়টি এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দিশেহারা অভিভাবকরা মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকদের কয়েকজন। তারা বলেন, সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়ার পর প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পরিবারকে সামাজিক ও আর্থিক সংকটে পড়তে হয়।
এক অভিভাবক বলেন, “সন্তানকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু মাদকের কারণে যদি সে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে পরিবারের কষ্টের শেষ থাকে না। প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকিতে স্থানীয় যুব প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতা অব্যাহত থাকলে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার এবং অনলাইন জুয়ার নানা প্রচারণা তরুণদের সহজেই আকৃষ্ট করছে।
তাদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক ও জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিবারে নজরদারি, খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রি ও সেবনের কথা জানা থাকলেও সব ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান চোখে পড়ছে না। এ কারণে কোথাও কোথাও মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকলে তার ধারাবাহিকতা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও অনলাইন জুয়ার অভিযোগগুলো যাচাই করে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রয়োজন মূল হোতাদের শনাক্তকরণ
সচেতন নাগরিকদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু সেবনকারী বা ছোটখাটো বিক্রেতাদের আটক করলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থের লেনদেন এবং পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে। একইভাবে অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত মাধ্যমগুলো শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সমাজের বিশিষ্টজনরা বলছেন, একটি প্রজন্মকে মাদক ও জুয়ার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিবারকে যেমন সন্তানদের চলাফেরা ও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে, তেমনি প্রশাসনকেও অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে।
এলাকাবাসীর দাবি
কয়রার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবি, উপজেলাজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা, মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, মাদকের মূল সরবরাহকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তকরণ এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো হোক।
তাদের মতে, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এর সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠন ও যুবসমাজকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।